প্রকাশিত: ০৭/০৯/২০১৭ ৭:৫৭ এএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ১:৫৭ পিএম

তোফায়েল আহমদ ও জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, টেকনাফ সীমান্ত থেকে::
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের খোঁজে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করছিলেন এক রোহিঙ্গা দম্পতি। তখনই ঘটে বিপত্তি। ট্রলারের মাঝি ১০ হাজার টাকা দাবি করে বসে। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে রোহিঙ্গা নারী ছুরা খাতুনকে অনেকটা জোর করে তাদের নির্ধারিত ঘরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায় মাঝি। ঠিক ওই সময় কালের কণ্ঠ’র দুই প্রতিবেদক সেখানে পৌঁছলে দৌড়ে এসে সাহায্য চান তাঁরা। এ সময় স্বামী মতিউর রহমান বলেন, ‘সাগরে এত মায়া, আর আধাঘণ্টার ব্যবধানে কূলে এমন হিংস্র রূপ—আমি জীবনে দেখিনি। ’ পরে জানা যায়, মাঝির নাম মোহাম্মদ আলী।

এই রোহিঙ্গা দম্পতি জানান, মিয়ানমারের রাসিডং শীলখালী গ্রামে বংশপরম্পরায় তাঁদের বসবাস। তাঁদের এক মেয়ে ও এক ছেলে। মিয়ানমারে সহিংসতা শুরুর দিনই গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয় স্থানীয় রাখাইনদের সহায়তায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী।
সেদিনই ঘর ছাড়েন তাঁরা। কোথাও হেঁটে, কোথাও নৌকায় করে পাহাড় ও সমতল পাড়ি দিয়ে ১১ দিন পর গত মঙ্গলবার শাহপরীর দ্বীপের বিপরীতে নাফ নদের পাড়ে পৌঁছেন। গতকাল বুধবার সকালে ট্রলারযোগে আরো ৩০-৪০ জন রোহিঙ্গাসহ দুপুর ১২টার দিকে টেকনাফের শামলাপুর উপকূলে পৌঁছেন তাঁরা। টহল জোরদার থাকায় ট্রলারটি পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের একটু গভীরে অবস্থান নেয়। সৈকত এলাকা থেকে বিজিবি সদস্যরা অন্যদিকে যেতেই দুপুর ২টার দিকে ট্রলার থেকে শামলাপুর সৈকতে তাঁদের নামিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনা আগে থেকেই প্রত্যক্ষ করছিল কালের কণ্ঠ’র একটি টিম।

মতিউর রহমান বলেন, শামলাপুরের মোহাম্মদ আলী মাঝি মিয়ানমার সীমান্তে গিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছে দিতে তাঁদের কাছে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করে। কিন্তু এত টাকা তাঁরা পাবেন কোথায়? হাতে যা ছিল তা নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। দরদাম করে ঠিক হয় জনপ্রতি তিন হাজার টাকা।

‘শত শত বন্দিশালা’ : গতকাল শুধু শামলাপুর ঘাটেই দেখা গেছে ৪০-৫০টির মতো ট্রলার। একইভাবে ট্রলারযোগে শামলাপুর সৈকতে পৌঁছে মিয়ানমারের রাসিডং নদীপারের শফি উল্লাহর পরিবার। ১১ সদস্য নিয়ে শামলাপুর গ্রামের রহমত উল্লাহ মাঝির ট্রলারে করে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এসেছে তারা। হাতে টাকা ছিল না, তাই একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয়। মালয়েশিয়ায় রয়েছেন রহমত উল্লাহর ভাই। রহমত মোবাইলে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও নারাজ রহমত মাঝি। পরে পুলিশি সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।

শুধু পশ্চিমের ৪৫ কিলোমিটার উপকূল নয়, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদ থেকেও। উপকূলের বসতবাড়ি, পাহাড়ি স্থান, ঝাউবাগান, স্কুল, মাদরাসার উঠান এমনকি মসজিদের উঠানকেও দালালরা বন্দিশালা বানিয়ে রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে টাকা আদায় করছে—এমন অভিযোগ অহরহ। শামলাপুর দারুল ইসলাম দাখিল মাদরাসার জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৫০ রোহিঙ্গাকে, যাদের মাদরাসা কমিটির সভাপতি ছৈয়দ করিমের ভাইপো আনসার আলী টাকার জন্য আটকে রেখেছিলেন। ছৈয়দ করিমের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ বেশ পুরনো। এরই মধ্যে আরো একবার বিদেশিসহ আটক হয়েছিলেন তিনি। ঢুকে পড়েছিলেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কমিটিতেও। পরে অবশ্য তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে বাদ দেওয়া হয়। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুর বশর বলেন, একটি জঙ্গিচক্র মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মায়া দেখিয়ে বাংলাদেশে রেখে নিজেদের ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত রয়েছে। এসব তৎপরতা সম্পর্কে নজরদারি বাড়ানো দরকার কলেও জানান তিনি। একইভাবে সাবেক মেম্বার মোক্তার আহমদ মিয়ানমারে চার-পাঁচটি ট্রলার পাঠিয়ে রোহিঙ্গা এনে বাড়িতে আটকে রেখে টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য : বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কাঞ্চন কান্তি দাস জানান, পুলিশ এরই মধ্যে উপকূলের বেশ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে দুই শতাধিক রোহিঙ্গাকে জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করেছে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. মাইন উদ্দিন খান জানান, টেকনাফ পৌর শহরেও বেশ কয়েকটি বাসাবাড়িতে রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের খবর পাওয়া গেছে। এমন অভিযোগে টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী পাড়ায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ দালালকে আটক করে গতকাল ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রতিজনকে ছয় মাসের সাজা প্রদান করা হয়। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার ড. কে এম ইকবাল হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে যাতে কেউ মুক্তিপণ আদায় করতে না পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে। এরই মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে দুই শতাধিক রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাচারকাজে জড়িত দালালদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলেও তিনি কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেন। বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজ উদ্দিন জানান, রোহিঙ্গা আটকে রেখে টাকা আদায় এখন বড় ব্যবসা হয়ে গেছে।

‘বালুখালীতে নতুন ক্যাম্প’ : কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বালুখালীতে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন রোহিঙ্গা শিবির। মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদসচিবের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রায় তিন-চার একর বনভূমিতে এই ক্যাম্প করা হচ্ছে। সভায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আলী হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে রোহিঙ্গা বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় বালুখালী এলাকায় একটি বড় আশ্রয়শিবির (মাদার ক্যাম্প) গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা যায়। শিবিরে থাকবে সীমানা দেয়াল, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সুবিধা। জেলা প্রশাসক আলী হোসেন এই সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এরই মধ্যে সম্ভাব্য স্থানও পরিদর্শন করা হয়েছে। বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে এরই মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এ ব্যাপারে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তা আলী কবির বলেন, কয়েক দিন আগে শতাধিক লোক নিয়ে রোহিঙ্গাদের দখলীয় জমি উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এত রোহিঙ্গা ওই বনভূমিতে অবস্থান নিয়েছিল যে তা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এখন সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকেই বন বিভাগের জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে আশ্রয়শিবির।

‘আড়াই হাজার প্রতিহত’ : টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকালে বিজিবি মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে বুধবার ১১টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দুই হাজার ৬৪৯ জন রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ প্রতিহত করেছে। টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম জানান, এক দিনেই আড়াই হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নাফ নদ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ২ বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদস্যরা তৎপর রয়েছেন। এর পরও যেসব রোহিঙ্গা এরই মধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে তাদের সঙ্গে যথাসম্ভব মানবিক আচরণ করা হচ্ছে, যাতে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট না হয়।

‘১০ লাশ উদ্ধার’ : বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ বদর মোকাম পয়েন্টে গতকাল ভোরের দিকে রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত দুজন নারী ও তিন শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছ। এদিকে উখিয়ার কাছে নাফ নদে ভাসমান আরো পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে বিজিবি। পরে জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয় বলে নিশ্চিত করেন উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের। স্থানীয় ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিন বলেন, নাফ নদে আরো বেশ কয়েকটি লাশ ভাসতে দেখা গেছে। তবে এসব লাশ নাফ নদের মিয়ানমার অংশে থাকায় উদ্ধার করা যায়নি। জানা যায়, ভাটার টানের মধ্যে তড়িঘড়ি একটি ট্রলার থেকে নামানোর সময় ডুবে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
সুত্র: কালেকন্ঠ

পাঠকের মতামত

ইয়াবা কারবার, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আতঙ্কে উখিয়া-টেকনাফ

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধ, সশস্ত্র তৎপরতা ও অপহরণ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের ...

টেকনাফের ‘জাফর চেয়ারম্যান’ দুনীর্তির দায়ে ৭ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদকে সম্পদের তথ্য গোপন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ...

অপহরণ-সন্ত্রাসে জনশূন্য জুম্মাপাড়া, আতঙ্কে ঘরছাড়া ২০০ পরিবার

রহমত উল্লাহ • কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে অপহরণ আতঙ্ক বিরাজ ...

কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণের উদ্যোগে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু

কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার লক্ষ্যে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ...
Single Page Footer